চাঁদাবাজি-খুনে বারবার তাঁর নাম, যেভাবে সন্ত্রাসী হয়ে উঠলেন ডেভিড ইমন

0
ইমন

অল্প সময়ে চট্টগ্রামের অপরাধজগতে পরিচিত হয়ে ওঠেন ডেভিড ইমন। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি, একের পর এক হত্যা, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁর নাম উঠে এসেছে বারবার।

মাত্র কয়েক বছরে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে হয়েছে ১৫টি মামলা। পুলিশ বলছে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন তিনি। গত মঙ্গলবার রাতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক বর্তমান দিনকালকে বলেন, ‘সন্ত্রাসী ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকেন। পুলিশের অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।’

নাজিমুল হক আরও বলেন, ‘ইমন প্রায়ই আসা-যাওয়া করেন। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তাঁর কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে।’

ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে এসে অনুশীলন করতেন। পরে নগরের অক্সিজেনে খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে। অনুশীলন করতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে।

চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইমন খুবই ভালো ক্রিকেট খেলত। বাঁহাতি লেগ স্পিনার (চায়নাম্যান) হিসেবে তার ভালো পরিচিতি ছিল। ব্যাটিংও ভালো করত। জাতীয় দলের খেলোয়াড় কিংবা বিদেশি দলের খেলোয়াড়েরা চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে ইমন বল করত। তার ভালো সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই খেলা থেকে উধাও হয়ে যায়। ২০২০ সালের পর তাকে আর দেখা যায়নি।’

ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হান্নান চৌধুরী ইমনের প্রতিবেশী। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে ভালো ক্রিকেট খেলত ইমন। পরে শহরে চলে আসে প্রশিক্ষণের জন্য। পরে দেখি নানা অপরাধে তার নাম আসছে। অথচ ভালো ক্রিকেটার হয়ে কাঞ্চননগরের সুনাম বাড়াতে পারত। এখন সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিষয়টি দুঃখজনক।’

পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেননি ইমন। ২০২০ সালে করোনার পর তিনি পুরোপুরি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

২০২২ সালে ওমানে যান ইমন। বছরখানেক পর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি। তখন নগরের বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান শুরু করেন। সেখানেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

পুলিশের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর নগরের অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে ইমনের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নজরে আনে।

গ্রেপ্তারের পর মোবারক হোসেন ইমন

একের পর এক হত্যা মামলার আসামি

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীতে জোড়া খুন, চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হয়েছে।

৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে ইমনের একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বলছে, অস্ত্র ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় মোটরসাইকেল ভাড়া ও সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ের দায়িত্বও ছিল তাঁর।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইমন। কিন্তু গ্রেপ্তারের মাত্র ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান। এরপর তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে জানায় পুলিশ।

ফোনের ওপাশের আতঙ্ক

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন। অপরজন মোহাম্মদ রায়হান।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবির জন্য বেশি ফোন করতেন ইমন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে নগরের বায়েজীদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনকে ফোন করে তিনি বলেন, ‘৫০ হাজার পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে গিয়ে মেরে ফেলব। তোর ভাইকে যেমন ১০ হাজার মানুষের মাঝখানে গুলি করে মেরেছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

URL has been copied successfully!