খুলশী থানার সেকেন্ড অফিসার গোলাম মোঃ নাসিমকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়, হয়রানি ও গ্রেপ্তার বাণিজ্য নিয়ে প্রশ্ন

0
WhatsApp Image 2026-11-07 at 1.12.01 PM

চট্টগ্রাম বুরো প্রধান | দৈনিক বর্তমান দিনকাল

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার সেকেন্ড অফিসার গোলাম মোঃ নাসিমকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। অতীতে চান্দগাঁও ও বায়েজিদ থানায় দায়িত্ব পালনকালে বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি, কথিত গ্রেপ্তার বাণিজ্য, রিমান্ডের নামে অর্থ আদায় এবং নিরীহ ব্যক্তিদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। পাশাপাশি তাঁর সম্পদ অর্জন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং কর্মস্থল পরিবর্তন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।


সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত বিভিন্ন মন্তব্যে অভিযোগকারীরা তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছেন। একজন মন্তব্যকারী দাবি করেন, বায়েজিদ থানায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গভীর রাতে আদালতে নেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন। এ ঘটনায় আইনি প্রতিকার চাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন ওই ব্যক্তি।
অন্যদিকে, চান্দগাঁও থানায় দায়িত্ব পালনকালে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন এবং রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে। আরও কয়েকজন ব্যক্তি বায়েজিদ থানায় দায়িত্ব পালনকালে বিএনপি-সমর্থিত পরিবারগুলোর ওপর হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ এনে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বিতর্কিত ছবি ঘিরে নতুন প্রশ্ন
অভিযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বায়েজিদ থানায় দায়িত্ব পালনকালে শেরশাহ বাংলা বাজার ও চন্দ্রনগর এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচিত বাহার মিয়া, বাদল ও আনোয়ারসহ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রয়াত মেহেদী হাসান বাদলের কবরে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।


এ ছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব ছবির স্থান, সময়, প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে ছবিগুলোকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
২০০ পিস ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ ও সাময়িক বরখাস্তের দাবি
আরও একটি গুরুতর অভিযোগে বলা হয়েছে, মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির এক কর্মচারীকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ২০০ পিস ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর ঘটনায় এসআই গোলাম মোঃ নাসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল এবং এ ঘটনায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি, এর কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রকৃত সত্যতা জানতে পুলিশের দাপ্তরিক আদেশ, বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার নথি যাচাই করা প্রয়োজন।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোলাম মোঃ নাসিমের শৈশব কেটেছে খুলশী থানার নিকটবর্তী ঝাউতলা ডিজেল কলোনি এলাকায়। তাঁর বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
এ অবস্থায় শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা এলাকার কাছাকাছি থানায় কীভাবে তাঁর পোস্টিং হয়েছে, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তার নিজ এলাকায় কর্মস্থল থাকা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। এ বিষয়ে প্রচলিত বদলি ও পদায়ন নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
সম্পদ অর্জন নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি
গোলাম মোঃ নাসিমের সম্পদ অর্জন ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও কয়েকজন ব্যক্তি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, তাঁর বৈধ আয়ের উৎস এবং অর্জিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর অতীত ও বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত নথি, মামলা ও রিমান্ডের তথ্য, বিভাগীয় তদন্তের কাগজপত্র এবং সম্পদের বৈধ উৎস পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।


এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অভিযোগকারীরা।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গোলাম মোঃ নাসিমের বক্তব্য, তাঁর দাপ্তরিক ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
জনস্বার্থে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
১. চান্দগাঁও ও বায়েজিদ থানায় দায়িত্ব পালনকালে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু?
২. কোনো নিরীহ ব্যক্তি হয়রানি বা মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে থাকলে তার প্রতিকার কী?
৩. সাময়িক বরখাস্তের অভিযোগের পেছনে প্রকৃত ঘটনা কী ছিল?
৪. রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বিতর্কিত ছবিগুলোর প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী?
৫. তাঁর সম্পদ ও আয়ের উৎস যথাযথভাবে যাচাই করা হবে কি?
জনস্বার্থে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্মান ও অধিকার সুরক্ষাও নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

URL has been copied successfully!