অপ্রতিম হত্যা: ৪টি সিসিটিভি ক্যামেরায় নতুন তথ্য পাওয়া গেল

0
Aprotim

তামজিদ হাসান, দৈনিক বর্তমান দিনকাল,
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের কোল খালি করে চলে গেছে তার ১৩ বছরের প্রাণোচ্ছল সন্তান, ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। একটি ফুটফুটে জীবনের এমন করুণ পরিণতি সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। অবশেষে সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য রহস্য ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।

গোয়েন্দাদের হাতে সম্প্রতি ধরা পড়ে মামলার এক আসামি। আর ঠিক তখনই উন্মোচিত হতে থাকে ক্লু-হীন এ হত্যাকাণ্ডের নতুন সব দিক। গ্রেফতার আসামির ফোনে ঘন ঘন আসতে থাকা কয়েকটি অস্বাভাবিক কলই হয়ে ওঠে তদন্তের মূল চাবিকাঠি। পুলিশ সেই কলগুলোর সূত্র ধরে এগোতেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে শোকাতুর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতি এক মানববন্ধনের আয়োজন করে। সেখানে সহকর্মীর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার শীলা উপস্থিত সবার সামনে তদন্তের এ নতুন ও চাঞ্চল্যকর অগ্রগতি তুলে ধরেন।

ঘটনার দিন ছিল শুক্রবার। বাসাতেই ছিল অপ্রতিম। কিন্তু বাইরে তখন তৈরি হচ্ছিল এক সুচতুর ফাঁদ, যার নেপথ্যে ছিল মোবাইলের অনবরত ভেসে ওঠা কিছু খুদে বার্তা।

তদন্তকারী সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে যেকোনো মূল্যে বাসা থেকে বের করে আনাই ছিল অভিযুক্ত তুহিনের মূল উদ্দেশ্য। তাই সে বারবার অপ্রতিমের ফোনে মেসেজ পাঠাতে থাকে, তাকে বাইরে আসার জন্য চাপ দিতে থাকে। যখন সাধারণ কথায় কাজ হচ্ছিল না, তখন ফেলা হয় মোক্ষম টোপটি। অপ্রতিমকে বলা হয়, তার কাছে থাকা দামি ‘আইফোনটি’ দিয়ে তারা টিকটকের জন্য সুন্দর সুন্দর ভিডিও বানাবে আর ছবি তুলবে।

কিশোর মনের ব্যাকুলতা আর ছবি তোলার ঝোঁক শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। বেলা ঠিক আড়াইটার দিকে মায়ের মোবাইল ফোনটি সঙ্গে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় অপ্রতিম। স্বজনরাও ভেবেছিলেন, বন্ধুদের সঙ্গেই হয়তো একটু ছবি তুলতে গেছে ছেলেটি। কিন্তু কে জানত, সুন্দর একটা ছুটির দুপুরে ছবি তোলার সেই আহ্বানের পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো এক মর্মান্তিক নিয়তি! বাইরে পা রাখার পর অপ্রতিম আর কখনোই নিজের চেনা ঘরে ফিরে আসেনি।

পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি ধরা পড়ে। ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে, কথা বলছে। তাদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে যেতে দেখা গেছে। অন্য একটি ফুটেজে চারজনকেই একসঙ্গে পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

স্থানটি লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার এক নির্জন জঙ্গল। চেনা লোকালয় ছেড়ে মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরের এক আঁকাবাঁকা কাঁচা পথ ধরে পৌঁছে যেতে হয় সেই থমথমে স্থানে।

লিশ সূত্র থেকে পাওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হেঁটে সেই পাহাড়ের পথ ধরে এগোচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, নির্জন সেই জায়গায় পৌঁছানোর পর তাদের সাথে যোগ দেয় আরও দুই কিশোর।

শুক্রবার বিকাল তখন ঘনিয়ে আসছে, সময়টা আনুমানিক পাঁচটা থেকে ছয়টার মাঝামাঝি। নির্জনতার সুযোগ নিয়ে অপ্রতিমের হাত থেকে আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু নিজের জিনিস বাঁচাতে সচেষ্ট কিশোর অপ্রতিম আঁকড়ে ধরে সেটি, শুরু হয় চরম ধস্তাধস্তি।

প্রতিবাদের মুখে তুহিন পাশ থেকে একটি বাঁশের লাঠি তুলে নিয়ে আঘাত করে বসে অপ্রতিমের মাথায়। এরপর বাকিরাও একে একে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়— একটি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ে মাটিতে। হত্যাকাণ্ডের পর ঠান্ডা মাথায় রক্তমাখা স্থানটিতে অপ্রতিমের নিথর দেহ ফেলে রেখে, কেবল সেই মোবাইলটি নিয়ে চম্পট দেয় ঘাতকের দলটি।

সিয়াম নামের আরেক তরুণ ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে ঘটনার সময় তিনি আশপাশে থেকে পাহারা দেওয়ার মতো কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন কি না, সেটি যাচাই করছে পুলিশ। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ জানতে পেরেছে, এলাকাটি বেশ নির্জন। এ কারণে বাইরে থেকে সহজে সেখানে কী ঘটছে, তা বোঝার সুযোগ কম।

অপ্রতিমের মরদেহে মাথার গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এর কিছু ক্ষত মৃত্যুর পর তৈরি হয়ে থাকতে পারে। রাতে শিয়াল মরদেহ টানাটানি করেছিল। এ বিষয়ে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যও পর্যালোচনা করছে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

URL has been copied successfully!