কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড—কী ঘটেছিল সেদিন?
তামজিদ হাসান, দৈনিক বর্তমান দিনকাল,
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের মরদেহ।
অপ্রতীম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতীম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি অপ্রিতম। পরে তার বাবা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
প্রায় ২২ ঘণ্টা পরে, ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় অপ্রতীমের মরদেহ। তার মাথায় ছিল আঘাতের চিহ্ন।
পুলিশ তদন্তে উঠে আসে, অপ্রতীমের সঙ্গে তার বয়সের তুলনায় বড় কিশোরদের চলাফেরা ছিল। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রথমে সাইফুল ইসলাম তুহিন নামে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে। তুহিন এর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কুমিল্লা পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, অপ্রতীমের কাছে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ফোনটি নিতে বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার কাছ থেকে ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। তুহিনের বাসা থেকে অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের মধ্যে তিনজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল।
এরই মধ্যে, সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ এবং কামরুল হাসান আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
অপ্রতীমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড নিয়েও এখন নানা প্রশ্ন উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু স্ক্রিনশটে পোস্ট এবং অশালীন ভাষার ব্যবহার দেখা গেছে।
মাত্র ১৩ বছরের অপ্রতীমের মৃত্যু তাই এখন শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়—তার সঙ্গে কারা মিশত, কোথায় যেত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কী ধরনের যোগাযোগ ছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে এখানেই শেষ নয়,
শুধু আইফোন নয়, অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ডের পেছনে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তদন্তসূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ অপ্রতীমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। সম্প্রতি অপ্রতীম সেই টাকা ফেরত চাইছিল।
এ নিয়ে ফাহাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। পুলিশের তদন্তে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে এসেছে।
তদন্ত যত এগোচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা নয়—এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিরোধ, অসম বয়সের বন্ধুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতীমের কর্মকাণ্ড নিয়েও নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে।
