ন্যাটোর সতর্কবার্তা : ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে পুতিন
ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রমেই বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপে ন্যাটোর ডেপুটি কমান্ডার এয়ার চিফ মার্শাল স্যার জন স্ট্রিংগার।
এস্তোনিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি নিরাপত্তা সম্মেলনে তিনি বলেন, ইউরোপে রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তর্ঘাত, গুপ্তচরবৃত্তি এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইউরোপীয় নেতারা রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, মস্কো আরো সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষা করতে পারে। তবে অন্যরা পরিস্থিতি শান্তভাবে মোকাবেলার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্ট্রিংগার বলেন, ন্যাটোর সদস্যদের বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে এবং অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো এড়িয়ে চলতে হবে।
তার মতে, এমন প্রতিক্রিয়া উসকে দেওয়াই পুতিনের উদ্দেশ্য হতে পারে। মঙ্গলবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রিংগার বলেন, কোনো ঘটনা দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে, তা অনেক সময় স্পষ্টভাবে বোঝা কঠিন।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা ঠেকাতে রাশিয়ার জিপিএস জ্যামিং বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ব্যবহারের কারণে কোনো ড্রোন পথ হারিয়ে ন্যাটোর আকাশসীমায় ঢুকে পড়তে পারে। স্ট্রিংগার বলেন, রাশিয়া এ ধরনের কর্মকাণ্ড আরো বাড়াতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মস্কো ইতোমধ্যে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ন্যাটোর কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এবং পরে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দাবি করতে পারে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও এই আশঙ্কার সঙ্গে একমত হয়েছেন। সম্ভাব্য ড্রোন হামলা ও সাইবার আক্রমণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বর্তমানে ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না।
সংবেদনশীল নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে আহ্বান জানিয়ে আসা এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার কর্মকর্তারাও পরিস্থিতি আরো গুরুতর হয়ে উঠতে পারে, এমন আশঙ্কার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি গোপন নাশকতামূলক তৎপরতার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার ড্রোন এবং কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের ঘটনাও দেখেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) একটি ইন্টারেক্টিভ মানচিত্রে ওই গোপন তৎপরতার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চে যেখানে এমন ৫৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, তা বেড়ে ২১০টিরও বেশি হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ভাঙচুর, প্রচারণা ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, অন্তর্ঘাত এবং সাইবার হামলার মতো কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আগস্টে জার্মান কর্মকর্তারা লিপজিগ বিমানবন্দরে একটি নাশকতার পরিকল্পনার সঙ্গে মস্কোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, জেট জ্বালানি বহনকারী একটি ইউক্রেনীয় বিমানের পাশে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন পাওয়া যায়।
গত মাসে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জানান, লন্ডনের বাইরে একটি ড্রোন কারখানায় নাশকতা চালানোর রুশ পরিকল্পনা তারা নস্যাৎ করেছেন। এর আগে আগস্টে এস্তোনিয়ার একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন এবং বুলগেরিয়ার একটি অস্ত্রাগারে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনার কোনোটির জন্য প্রকাশ্যে রাশিয়াকে দায়ী করা হয়নি।
কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনলাইনের মাধ্যমে অনেক নাশকতাকারীকে নিয়োগ করে থাকে। তাদের কেউ কেউ যে রাশিয়ার হয়ে কাজ করছেন, তা-ও জানেন না। ফলে এসব ষড়যন্ত্র শনাক্ত করা এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মে মাসে এপি রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কোনো গোপন অভিযান চালাচ্ছে কি না জানতে চাইলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, এর পক্ষে কোনো প্রমাণ থাকলে তা দেখাতে হবে।
ন্যাটোর ডেপুটি কমান্ডার এয়ার চিফ মার্শাল স্যার জন স্ট্রিংগার এবং এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিখাল দুজনেই বলেছেন, ইউরোপে গোপন হামলা ও নাশকতার ঘটনা বাড়ার কারণ ন্যাটো দেশগুলোর প্রতিরোধের ব্যর্থতা নয়। বরং তাদের মতে, এর সঙ্গে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
স্ট্রিংগার বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোচ্ছে না বলে পুতিন ন্যাটোর মিত্রদের মধ্যে বিভেদ তৈরির বিভিন্ন উপায় খুঁজছেন। এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাল বলেন, রাশিয়া চাপের মধ্যে রয়েছে এবং এ কারণে মস্কো ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন দুর্বল করতে ইউরোপে তাদের তৎপরতা বাড়াতে পারে। তিনি পুতিনের পরিস্থিতি বোঝাতে ‘কোণঠাসা ইঁদুর’ উপমা ব্যবহার করেন।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল স্যার রিচার্ড নাইটনের মতে, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অগ্রগতি ধীরগতির। এই অগ্রগতির জন্য রাশিয়াকে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের হতাহতের মতো বড় মূল্য দিতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার কারণে দেশটির ৮৩টি অঞ্চলের মধ্যে ৮০টিতে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এসব চাপের পরও ইউক্রেনে নিজেদের লক্ষ্য থেকে পুতিন সরে আসছেন—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিখাল বলেন, পুতিন এমন ধরনের গোপন হামলা ও নাশকতার মাধ্যমে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে পরীক্ষা করছেন, যেগুলোর জন্য সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করা কঠিন। তার মতে, এর মাধ্যমে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হতে পারে।
তবে মিখাল মনে করেন, ন্যাটোর সম্ভাব্য পাল্টা জবাব এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার বিপুলসংখ্যক সেনা ব্যস্ত থাকার কারণে বর্তমানে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউরোপে সরাসরি প্রচলিত সামরিক হামলার আশঙ্কা খুবই কম।
মিখাল বলেন, পুতিন যতদিন তার সামরিক লক্ষ্য পরিবর্তন না করবেন, ততদিন রাশিয়ার এই ধরনের বৈরী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকতে পারে। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড মোকাবিলার অন্যতম প্রধান উপায় হলো ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত রাখা।
ন্যাটো ও ইউরোপীয় নেতাদের বক্তব্যে ইউরোপে রাশিয়ার গোপন তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি কতটা, সে বিষয়ে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে পুরোপুরি একমত নেই।
